শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রাণবন্ততায় যোগসাধনা এক নিয়ামক শক্তি হিসাবে কাজ করে। যোগসাধনায় ৪০০০-এর ও বেশি আসনের চর্চা করেছেন সাধকেরা। যার বেশিরভাগই একজন যোগসিদ্ধ গুরুর তত্ত্বাবধানে অনুশীলন সম্ভব। আধুনিককালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারে মানুষ প্রয়োজনীয় সবকিছু হাতের নাগালে পাওয়ায় শারীরিক পরিশ্রম বিমুখ হয়ে পড়ছে। ফলে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো স্বাভাবিক ক্রিয়ায় অক্ষম হয়ে পড়ছে, যার দরুন আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে যোগসাধনার ওপর। দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কর্মক্ষমতা গতিশীল করে শরীরকে সুস্থ রেখে মনের ওপর নিজের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিজেকে যেকোন সাধনা বা কর্মোপযোগী করে তোলার লক্ষ্যেই আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে দ্রাবিড় সাধকরা যোগব্যায়াম উদ্বাবন করেন।

যোগ

‘যজ্’ ধাতু থেকে যোগ শব্দের উৎপত্তি। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বন্ধন বা যুক্ত করা বা উন্নীত করা। একের সঙ্গে অপরের মিলন বা একত্রিত হওয়া বা তাদের একত্রিত করাকে যোগ বলা হয়। ধর্মানুশীলনের ক্ষেত্রে যোগ হলো জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার বা ঈশ্বরের যোগসাধন করা। অর্থাৎ মনের প্রবৃত্তিগুলোকে একান্তভাবে নিরোধ করে নিষ্কামভাবে একাত্মচিত্তে বিধাতার সঙ্গে এবং তাঁর সত্য চেতনার সঙ্গে যে মিলন তা-ই যোগ। যোগাসন শুধুমাত্র দেহভঙ্গি। এই দেহভঙ্গিতে দেহের প্রতিটি পেশি, স্নায়ু ও গ্রন্থিরও ব্যায়াম হয়। তাতে দেহ ও মনের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পায়, শরীর ও মন সুস্থ, হালকা এবং স্ফূর্তিদায়ক হয়ে ওঠে।

ধ্যানে উপবেষ্টিত শিব মূর্তি; Image Courtesy: timesofindia.indiatimes.com

যোগাসনে দেহের গঠন সুন্দর ও উজ্জ্বল হয়, দেহ বলশালী ও নমনীয় হয় এবং দেহ রোগমুক্ত হয়। দেহের মেদ কমাতে, শীর্ণতা দূর করতে যোগাসন কার্যকর জুড়ি নেই। স্থুলকায় মানুষের শরীর ও মন সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখার জন্য যোগের বিকল্প নেই। যোগসাধনায় দেহের অবসাদ ও ক্লান্তি দূর হয়, আত্মা ও মন একই কেন্দ্রবিন্দুতে নিবদ্ধ হওয়ার ফলে চিত্ত চাঞ্চল্য কমে যায়। প্রাচীন মনিষীগণ যোগসাধনার দ্বারাই শরীরকে সুস্থসবল ও নিরোগ রাখতেন।

যোগের বিবর্তনের ইতিহাস

যোগ সুপ্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই প্রচলিত। বিভিন্ন পরিবর্তন সাধনের ফলে এখন আমরা যাকে যোগাভ্যাস বলে জানি তা প্রকৃত যোগাভ্যাস থেকে অনেক আলাদা।

পতঞ্জলির মূর্তি; Image Courtesy: nobojagaran.com

প্রাক-বৈদিক যুগ (৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে)

পশ্চিমের বিশ্বাস অনুযায়ী যোগের আবির্ভাব ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বৌদ্ধ ধর্মের সূত্রপাতের সময়। কিন্তু হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর খনন কার্যের সময় যোগের বিভিন্ন ভঙ্গিমার ছবি পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় খ্রিস্টের জন্মের ৫০০০ বছর আগেও যোগের প্রচলন ছিল।

বৈদিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ – খ্রিস্টপূর্ব ৮০০)

ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসাবে, মনঃসংযোগ বাড়ানো জন্য এবং দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটানোর জন্য বৈদিক যুগে যোগাভ্যাস করা হত। আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার যোগসাধনাই ছিল তখন যোগের মূল লক্ষ্য। থমাস ম্যাকভিলি একটি যৌগিক মডেলকে সমর্থন করেন যেখানে প্রাক-আর্য যোগ প্রোটোটাইপ প্রাক-বৈদিক যুগে বিদ্যমান ছিল এবং এর পরিমার্জন বৈদিক যুগে শুরু হয়েছিল। বেদে বর্ণিত তপস্যাচর্চা, একাগ্রতা এবং শারীরিক ভঙ্গিগুলো যোগের পূর্বসূরি। জিমারের মতে, যোগ দর্শনকে অ-বৈদিক পদ্ধতির অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়, যার মধ্যে হিন্দু দর্শন, জৈনধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের সাংখ্য স্কুলও রয়েছে।

ঊপনিষদের যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ – খ্রিস্টপূর্ব ২৫০)

ঊপনিষদ, মহাভারত ও গীতাতে যোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। গীতাতে জ্ঞান যোগ, ভক্তি যোগ, রাজ যোগ ও কর্ম যোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ যুগে যোগ শুধুমাত্র শ্বাস বা ভঙ্গিমা সংক্রান্ত অভ্যাস ছিল না, তা প্রাত্যাহিক জীবনের অঙ্গ ছিল।

ঐতিহাসিক যোগসূত্র পাণ্ডুলিপি (সংস্কৃত, দেবনগরী) থেকে কিছু পৃষ্ঠা; Image Courtesy: journeybacktothesource.com

ক্ল্যাসিকাল যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ১৮৪ – খ্রিস্টপূর্ব ১৪৮)

ক্ল্যাসিকাল যুগে পতঞ্জলি ১৯৫টি সূত্রকে একত্রিত করে যোগকে একটা সংক্ষিপ্ত আকার দেন। তাঁর এ যোগদর্শন রাজযোগ নামে পরিচিত। রাজযোগের আটটি শাখা রয়েছে যা অষ্টাঙ্গ যোগ নামে পরিচিত। এই অষ্টাঙ্গ যোগের ধারণাটি পাওয়া যায় যোগসূত্রের দ্বিতীয় খন্ডের ২৯তম সূত্রে। অষ্টাঙ্গ যোগই বর্তমানে প্রচলিত রাজযোগের প্রতিটি প্রকারভেদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এই আটটি অঙ্গ হলো- যম (সামাজিক বিধি), নিয়ম (ব্যক্তিগত বিধি), আসন (শারীরিক ভঙ্গিমা), প্রাণায়াম (শ্বাস-প্রশ্বাসের বিধি), প্রত্যাহার (চেতনাকে সরিয়ে রাখা), ধারণ (মনঃসংযোগ), ধ্যান ও সমাধি। কিন্তু পতঞ্জলির সূত্রে কোন আসন বা প্রাণায়ামের নাম পাওয়া যায় না।

যোগের আটটি অঙ্গ

১। যম (পাঁচটি পরিহার): অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ।

২। নিয়ম (পাঁচটি ধার্মিক ক্রিয়া): পবিত্রতা, সন্তষ্টি, তপস্যা, সাধ্যায় ও ঈশ্বরের নিকট আত্মসমর্পণ। যম ও নিয়ম এর উদ্দেশ্য হল ইন্দ্রিয় ও চিত্তবৃত্তিগুলোকে দমন করা এবং এগুলোকে অর্ন্তমুখী করে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করা।

৩। আসন: যোগাভ্যাস করার জন্য যে ভঙ্গিমায় শরীরকে রাখলে শরীর স্থির থাকে কোনোরূপ কষ্ট ছাড়াই তাকে আসন বলে। অর্থাৎ স্থির ও সুখজনকভাবে অবস্থান করার নামই আসন।

৪। প্রাণায়াম (প্রাণবায়ু নিয়ন্ত্রণ): প্রাণস্বরূপ নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীবনশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ।

যোগের রয়েছে আটটি অঙ্গ; Image Courtesy: yogateket. com

৫। প্রত্যাহার: বাইরের বিষয়গুলো থেকে ঈন্দ্রিয় সরিয়ে শরীরের ভেতরকার গ্রন্তিগুলোতে নিবদ্ধ করা। আসন ও প্রাণায়ামের মাধ্যমে শরীরকে নিশ্চল করলেও মনকে সম্পূর্ণ নিশ্চল করা সম্ভব হয় না। এসময় ঈন্দ্রিয়গুলোকে বাহ্যবিষয় থেকে সরিয়ে চিত্তের ধ্যানগত করাই শ্রেয়।

৬। ধারণা: কোন একটি বিষয়ে মনস্থির করা। কোন বিশেষ বস্তুতে বা আধারে মনকে নিবিষ্ট বা আবদ্ধ করাই হলো ধারণা।

৭। ধ্যান: মনকে ধ্যানে বিলীন করা। যে বিষয়ে চিত্ত নিবিষ্ট হয়, সে বিষয়ে যদি একাগ্রচিত্তে একাত্মতা জন্মায় তাকে ধ্যান বলে। এই একাত্মতা হলো অবিরতভাবে কোন বিষয়ে চিন্তা করা।

৮। সমাধি: ধ্যানের সাথে চেতনার অবসাদ। যখন ধ্যান ঘনীভূত হয় তখন মন এমনভাবে ধ্যানে মগ্ন হয় যে ধ্যানে লীন হয়ে যায়। এইসময় ধ্যানের প্রক্রিয়া ও ধ্যানের বিষয়গুলোর মধ্যে পার্থক্য অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ধরনের মনের অবস্থাকে বলা হয় সমাধি। এই সমাধি লাভ যোগসাধনার সর্বোচ্চ স্তর, যোগীর পরম প্রাপ্তি। চৈতন্যের সর্বোচ্চ অবস্থায় উঠতে পারলে বৈচিত্র্যময় জগতের মোহ আর ব্যক্তিকে আকড়ে ধরতে পারে না।

পতঞ্জলিরযোগসূত্র

ব্রাহ্মন্যবাদী যোগ চিন্তার পরিচিতি শুরু হয়েছিল পতঞ্জলির যোগসূত্র থেকে, যার প্রকৃত নাম পাতাজরযোগাস্ত্র-সৌখ্য-প্রবর্তন। এই পাঠের আাধ্যাত্মিক ভিত্তি হলো ভারতীয় দর্শন যাকে বলা হয় সখ্য। 

যোগদর্শন হিন্দু দর্শনের ছয়টি মূল দার্শনিক শাখার একটি। যোগদর্শন সাংখ্য শাখাটির সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। পতঞ্জলি বর্ণিত যোগদর্শন সাংখ্য দর্শনের মনস্তত্ত্ব, সৃষ্টি ও জ্ঞান-সংক্রান্ত দর্শন তত্ত্বকে গ্রহণ করলেও সাংখ্য দর্শনের তুলনায় পতঞ্জলির যোগদর্শন অনেক বেশি ঈশ্বরকেন্দ্রিক। মনকে নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয় পতঞ্জলি যোগদর্শনে। এজন্য পতঞ্জলিকে আনুষ্ঠানিক যোগদর্শনের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

যোগের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস; Image Courtesy: nytimes.com

পোস্ট ক্ল্যাসিকাল যুগ (৮০০ খ্রিস্টাব্দ – ১৭০০ খ্রিস্টাব্দ)

পোস্ট ক্লাসিকাল যুগে পতঞ্জলিযোগের অনুগামীরা আসন, ক্রিয়া ও প্রাণায়ামের দ্বারা শরীর ও মনের শুদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়ে যোগাভ্যাসকে এক নতুন মাত্রা দেন। শরীর ও মনের শুদ্ধি এই যোগসিদ্ধদের সমাধির মত উচ্চ মার্গের সাধনাতে সাহায্য করতো। এই ধরণের যোগকে বলা হত হঠ্ যোগ।

আধুনিক যুগ (খ্রিস্টাব্দ ১৮৬৩ পরবর্তী)

শিকাগোর ধর্ম মহাসম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতার মাধ্যমে সারা পৃথিবীর কাছে যোগকে পৌঁছে দেন। অনেক যোগী পুরুষ যেমন মহর্ষি মহেষ যোগী, পরমহংস যোগানন্দ, রামন মহর্ষি ও আরও অনেকে পশ্চিম বিশ্বকে তাঁদের আধ্যাত্মিক জ্ঞানে এতটাই অনুপ্রাণিত করেন যে সারা বিশ্বই যোগকে ধর্ম নির্বিশেষে আধ্যাত্মিকতার এক অন্যতম অঙ্গ হিসাবে গ্রহণ করেছে, কোন বিশেষ ধর্মের আচার হিসাবে নয়।

পৃথিবীতে যোগকে ছড়িয়ে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন স্বামী বিবেকানন্দ; Image Courtesy: ekushey-tv.com

পরবর্তী সময়ে স্বামী বিবেকানন্দের ভারতবর্ষে সফলতার পর, উনিশ শতকের শেষভাগে এবং বিংশ শতকের প্রথম থেকেই বিভিন্ন সময়ে ভারতবর্ষেও যোগাচার্য্যগণ পশ্চিমী দেশসমূহে যোগবিদ্যার প্রচার করেন। ১৯৮০ এর দশকে পশ্চিমের দেশসমূহে শরীরচর্চা হিসেবে জনপ্রিয় ছিল যোগ। অবশ্য ভারতীয় সংস্কৃতির পরম্পরায় যোগকে কেবল এক শরীরচর্চার অঙ্গ মাত্র জ্ঞান করা হয় না, যোগের এক আধ্যাত্মিক ও ঈশ্বরীয়-স্বর্গীয় ধ্যানের অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Feature Image Courtesy: unsplash.com